মা ইলিশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

সম্পাদকীয়
মা ইলিশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে

চাঁদপুরের রূপালী ইলিশ (ফাইল ছবি)

২৬ অক্টোবর ২০২৬, ৯:১৭ পিএম

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই মাছ। পদ্মা-মেঘনার ইলিশের সুনাম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ হিসেবে পরিচিত এই জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক গভীর। কিন্তু ইলিশের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে এর নিরাপদ প্রজনন। আর সে জন্যই মা ইলিশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

ইলিশের জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় হলো প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য নদীতে আসে। এই সময় নির্বিচারে মা ইলিশ ধরা হলে বিপুলসংখ্যক ডিম থেকে নতুন ইলিশ জন্ম নেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাকৃতিক মজুত হুমকির মুখে পড়ে। তাই প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা কেবল একটি সরকারি নির্দেশনা পালন নয়; বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ রক্ষার অপরিহার্য পদক্ষেপ।

এ বছরও মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো মা ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া, যাতে ইলিশের নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের প্রথম ব্র্যান্ডিং জেলা চাঁদপুর ২০১৭ সালে ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ পরিচিতি লাভ করে। জেলার পদ্মা ও মেঘনা নদী এবং ইলিশকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এই পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ ব্র্যান্ডিং শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি চাঁদপুরের ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও মানুষের জীবিকার প্রতীক। তাই চাঁদপুরের মানুষের কাছে মা ইলিশ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বেশি। ইলিশের প্রাচুর্য কমে গেলে এই ঐতিহ্য ও পরিচিতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ইলিশ সংরক্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত জেলেদের জীবন-জীবিকা। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে আর্থিক সংকটে পড়েন। তাঁদের একটি বড় অংশের আয়ের প্রধান উৎস মাছ ধরা। ফলে কেবল আইন প্রয়োগ করে তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন কঠিন। এ সময়ে প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া, খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সহায়তা বিতরণে অনিয়ম বন্ধ করে প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা নিশ্চিত করতে হবে। জেলেরা যেন জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য না হন, সে দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে মৎস্য অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদীতে অবৈধ জাল ব্যবহার, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ আহরণ এবং অবৈধভাবে ইলিশ পরিবহন ও বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু জেলেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের মূল হোতাদের ছাড় দেওয়া হলে সংরক্ষণ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

এ ক্ষেত্রে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ কেনা-বেচা থেকে বিরত থাকা, অবৈধভাবে আহরিত মাছ না কেনা এবং সংরক্ষণবিষয়ক সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সবাই এ উদ্যোগে অবদান রাখতে পারেন। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

মা ইলিশ রক্ষা করা মানে শুধু একটি মাছের প্রজনন নিশ্চিত করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলেদের ভবিষ্যৎ, দেশের মৎস্যসম্পদ, খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতি। আজ প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিলে আগামী দিনে ইলিশের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর সুফল ভোগ করবেন জেলে, ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।

‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ পরিচিতি ধরে রাখতে হলে চাঁদপুরবাসীকে মা ইলিশ সংরক্ষণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞার যথাযথ বাস্তবায়ন, জেলেদের সহায়তা এবং অবৈধ মাছ আহরণ ও বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইলিশের ঐতিহ্য রক্ষা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি সবার সম্মিলিত কর্তব্য। তাই আসুন, মা ইলিশ রক্ষায় সচেতন হই, আইন মেনে চলি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইলিশের প্রাচুর্য নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসি।